নারী

নারী – পুরুষ বৈষম্য সকল অগ্রগতির অন্তরায় । বিশ্বের বহু দেশ অনেক পূর্বেই বিষয়টি উপলদ্ধিতে নিতে পেরেছে বলেই তারা সমৃদ্ধ হয়েছে । ফলে দেশগুলাে ‘ উন্নত বিশ্ব হিসেবে বিবেচিত । আমাদের দেশে এই বৈষম্য এখনাে প্রকট । এই বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসতে সচেষ্ট হলেও মহলবিশেষ থেকে নানা প্রতিবন্ধকতাকে মােকাবিলা করতে হয় । বিশ্বব্যাংক সূত্র বলছে , নারী – পুরুষের বৈষম্য বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার নিচ থেকে তৃতীয় । আমাদের দেশে অধিকাংশ নারীকে ঘরের কাজ নিয়েই সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয় । চাকরিজীবী নারীরাও কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে গৃহস্থলি কাজ করেন । হিসেব করলে দেখা যাবে , পুরুষের তুলনায় তারা কাজ করছেন বেশী । তবুও বৈষম্য থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না । যারা চাকরি বা ব্যবসা – বাণিজ্যে জড়িত নন এমন নারীর গৃহস্থলিই একমাত্র কাজ । সারা দিনই কাজের মধ্যেই ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে । তাদের কর্মঘন্টা পুরুষের কর্মঘন্টা থেকে অনেক বেশী হলেও তা আমলে নেয়া হয় না । এরূপ একজন নারী সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘর পরিস্কার , বিছানাপত্র গােছানাে , কাপড়চোপড় গােছানাের মধ্যদিয়ে দিনের কাজ শুরু করেন । তারপর নাস্তা তৈরী । তা আবার পরিবারের সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী একেক জনের জন্য একেক রকম হতে পারে । আবার একই রকমও হতে পারে । নাস্তাপর্ব শেষ করেই স্বামীকে কর্মস্থলে পাঠানাের আয়ােজন , সন্তানদের শিক্ষালয়ে পাঠানাের আয়ােজন করতে হয় । এবার শুরু হয় ঘরদোর ধােয়া – মােছা । বাসন – কোশন পরিস্কার করা । প্রয়ােজনে কাপড় চোপড় ধােয়া । কোলে যদি ছােট বাচ্চা থাকে তাহলে তাে সারাদিন – রাতেও কোনাে ফুসরত নেই । তাকে অল্প সময় পরপর পরিচর্যা করা । এতে করে সকাল পেরিয়ে যায় , দুপুর আসন্ন হয় । শুরু হয় দুপুরের খাবারের আয়ােজন । দুপুরের খাবার রান্না করতে জোগাড়যান্তি তাকেই করতে হয় । মাছ – মাংস , তরিতরকারি , পেয়াজ – রসুন কাটাকুটি , বাটনা বাটা প্রভৃতি নিয়েই তাকে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয় । দেখা যায় , তখনও পর্যন্ত পেটে চালান করতে পারেননি এক ফোটা পানিও । দুপুরের রান্না শেষ হলেই শুরু হয় পরিবেশন । পরিবারের লােকজনের খাওয়া – দাওয়া শেষে শুরু হয় এঁটো – কাটা , হাড়ি – পতিল , বাসন , থালা – বাটি পরিস্কারের পালা । এসব শেষ করে নিজে খেতে বসেন । পরিশ্রান্ত শরীরে কখনাে ভালাে লাগে না । হয়তাে অভুক্তই থেকে গেলেন ! বিকালে ফিরেন কর্তাব্যক্তিটি , যদি তিনি চাকরিজীবী হন , ব্যবসায়ী হলে ফিরেন বেশ রাত করেই । শুরু হয় তার পরিচর্যা । তালিম করতে হয় নানা ধরণের হুকুম । স্কুল – কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পরিবারের সদস্যরা ফেরে একে একে । তাদেরও পরিচর্যা করতে হয় ওই একই হাতে । বিকালের নাস্তার ব্যবস্থা করেই দিনের মতাে কিছুটা বিশ্রাম । এরপর রাতের খাবারের আয়ােজন । ক্ষেত্রবিশেষ দুপুরের বাড়তি খাবার দিয়ে চালিয়ে দেয়া হয় , তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবার রান্নার আয়ােজন সেই দুপুরের মতােই । রাত্রের খাবার পরিবেশন করে পরিবারের সদস্যদের শােয়ার আয়ােজন সেরে নিজে শরীরটা এলিয়ে দেন বিছানায় । তখন কিন্তু রাত্রের এক প্রহর শেষ হয়ে যায় । বিছানায় ক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিলেই হলাে না , স্বামী দেবতার বাহানা আছে না !সারা দিনই তার কেটে গেলাে এই রান্নাবান্না আর গৃহস্থালি কাজ নিয়ে । এটা গােলাে শহরের একটি সাধারণ পরিবারের নারীর সারাদিনের ছােটখাটো দৈনন্দিনকার কাজের খন্ডচিত্রমাত্র । গ্রামের চিত্র আরাে ভয়াবহ । গ্রামীণ অধিকাংশ স্ত্রীরা তাে বিয়ে করা ঝি ! উপরের আলােচিত কাজগুলাের সাথে যােগ হয় আরাে গতর খাটানাে কাজ । যেমন আছে উঠোন ঝাড় দেয়া , হাঁস – মুরগির ঘর – গােয়াল পরিস্কার করা , ধান সিদ্ধ করা , ধান ভানা , ঘর – উঠান লেপন করাসহ মাঠেও কৃষাণীর কাজ করা । শীতে পিঠা – পুলি বানানাে । স্বামী , শশুর – শাশুড়ির খেদমত ও হুকুম তামিল তাে আছেই । কিবা শহর বা গ্রাম , নারীর গৃহস্থলি কাজের কোনাে মূল্য নেই । তাদের কাজকে কাজ বলে স্বিকৃতিও দেয়া হয় না । শহরের নারীরা মনে হয়তাে অনেক ইচ্ছাই পােষন করে থাকেন । তিনি হয়তাে মনে করতেন লেখাপড়া করবেন । উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করবেন । লেখাপড়া শেষ করে একটা চাকরি করবেন । তিনিও হবেন পরিবারের একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি । কিন্তু দেখা যায় , লেখাপড়া শেষ হওয়ার আগেই পরিবারের চাপে তাকে বিয়ে করতে হয়েছে । হতে হয়েছে অন্য আরেক পরিবারের গৃহিণী । অনেকে অবশ্য লেখাপড়া শেষও করেছেন । বিয়ে হয়ে গেছে । চাকরি করার মনের বাসনাটা অপূরণ থেকে গেছে স্বামীর সংসারে এসে । এই সংসারে তিনি চাকরি করার স্বাধীনতাটা পাননি । বরং বিয়ের পরপরই সন্তান নেয়ার জন্য স্বামী কিংবা শ্বশুর বাড়ীর লােকের চাপ মেনে নিতে হয়েছে । বিশ্বব্যাংক বলছে মাত্র ছয়টি দেশে নারী পুরুষের সমতা আছে । আর নারী বৈষম্যের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর এসেছে ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ , যা খুবই নিচের দিকে । এতে আটটি সুচকে দেখানাে হয়েছে বাংলাদেশের নারীদের পরিস্থিতি । সেখানে যেমন রয়েছে সম্পত্তির অধিকার , বিয়ে করা , বা সন্তান নেয়ার মত বিষয় , তেমন রয়েছে যে কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি লাভের সুযােগের মত দিকগুলাে । পড়াশুনা শেষ করে একটি চাকরির আশা করেন অনেক নারী । কিন্তু হয় না । কারণ নারী বলে । চাকরির জন্য ট্রেনিং দেন অনেক নারী । তাদের পারফরমেন্স ভালাে হলেও পুরুষরা চাকরি পান বেশী । চাকরিদাতারা নারীদের নিতে তেমন একটা ভরসা পান না । এটা তাে অবশ্যই একটা বড় জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন । নারীদের সার্বিকভাবে এই বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে আমাদের দেশে । মনে করা হয় , নারীটাকে চাকুরিতে নিলে কিছুদিন পর তাে সে বিয়ে করবে , তারপর বাচ্চা . . . নানা রকমের ঝামেলা । তার চেয়ে একটা ছেলেকে নিয়ােগ দেয়াই ভালাে । যদিও কোনাে নারী চাকরি পান তবে বেতন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে তারা হন বৈষম্যের শিকার । নারী বলে কম বেতন দেয়া হয় । পুরুষরা বছর শেষে পদোন্নতি পান কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে সুবিবেচেনা করা হয় না । “ নারী , ব্যবসা ও আইন ২০১৯ ” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তৈরি করে বিশ্বব্যাংক । এর জন্য বিশ্বব্যাংক ১০ বছর ধরে বিশ্বের ১৮৭টি দেশে পর্যবেক্ষণ চালায় । সেখানে দেখা যাচ্ছে , বাংলাদেশে ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একই স্কোর – ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ অর্থাৎ অবস্থার উন্নতি হয়নি । বলা হয়ে থাকে , সরকার অন্তত ১০ বছর ধরে নারীদের উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে । তাহলে কেননা এই পরিস্থিতি ? প্রচার করা হয় , নারীদের সার্বিক অবস্থানে আগের চেয়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে । তবে পুরুষের সমান হতে পারেনি । আমাদের দেশটি মুসলমান অধ্যুষিত এবং সমাজ ব্যবস্থা পুরুষশাসিত । আগে থেকেই স্বাভাবিকভাবে নারীদের পশ্চাৎপদ করে রেখে দেয়া হয়েছিলাে ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থানের কারণে । এটা বলা অমূলােক হবে না যে , বাংলাদেশের নারীরা সার্বিক দিক থেকে উন্নতি করেছে , তারপরও পুরুষের সমান বা কাছাকাছি হতে পারছে না । দেশে জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী । তাহলে সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণও সমহার নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক । কিন্তু বাস্তবতা তা বলছে না । সমহার তাে দূরের কথা , ক্ষেত্রবিশেষ নারীর অংশগ্রহণই নেই । যা সত্যিকারঅর্থে হতাশাব্যাঞ্জক । গৃহস্থলি আর পােষাকশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ অবশ্য সংখাধিক্য হলেও অপরাপর ক্ষেত্রে তুলনামূলক অনেক কম ।

রুকসানা রহমান

Share on Social

2 thoughts on “নারী

  1. কই? আমি তো দেখি না!!!
    বর্তমান সরকার তো নারী বৈষম্য কোথাও রাখছে না। সরকারের সব সেক্টর এ নারী দের সমান অগ্রধীকার দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.