নারী শিক্ষার গােড়াপত্তন

আমাদের দেশে নারী শিক্ষার শুরুর ইতিহাসটা খুব একটা পুরাতন নয় । অবিভক্ত বাংলায় নারীশিক্ষার সূচনা এবং বিকাশ ঘটেছে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে । প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক – উচ্চ মাধ্যমিক এবং সর্বশেষে উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌছাতে এ দেশের নারী সমাজকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা ও বহু বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে । এই উপমহাদেশে আধ্যাত্মবাদের প্রভাব বহু আগে থেকেই রয়েছে । শিক্ষাব্যবস্থায় ছিলাে ধর্মীয় অনুভূতি দ্বারা আচ্ছাদিত । সম্প্রসরাণবাদী ব্রিটিশ নিজেদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থেই উপমহাদেশে একটি শিক্ষিত শ্রেণী তৈরির পরিকল্পনা করে । তবে তারা প্রথমে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তন করেনি । তাদের প্রবর্তিত শিক্ষার প্রথম উদ্যোগ হিসেবে ১৭৮১ খ্রিঃ ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা এবং ১৭৯১ সালে জোনাথন ডারকান কাশীতে সংস্কৃত কলেজ স্থাপন করেন । ইংরেজ শাসকরা ইউরােপীয় বৈজ্ঞানিক চিন্তা এবং জাগতিক ভাবধারাকে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে চায়নি । তারপরও ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ । ব্রিটিশভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সিতে তখন থেকেই উচ্চশিক্ষার গােড়া পত্তন হয় । মিশনারীদের উদ্যোগে ১৮১৮ সালে শ্রীরামপুর কলেজ এবং ১৮২০ সালে কলকাতা বিপস কলেজ স্থাপিত হয় । কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ স্থাপিত হয় ১৮২৪ সালে এবং মেডিক্যাল কলেজ স্থাপিত হয় ১৮৩৬ সালে । ১৮৩৫ সালে ঢাকায় স্থাপিত সরকারী বিদ্যালয়টিকে কলেজে উন্নীত করে নাম দেয়া হয় ঢাকা কলেজ । অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকে এদেশে ব্রিটিশ প্রবর্তিত যে শিক্ষাব্যবস্থা ছিলাে তা মূলত ধর্মীয় চেতনায় পরিবেষ্টিত । ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলে একটি শিক্ষানীতি প্রবর্তন করেন । প্রবর্তিত শিক্ষানীতিতে উল্লেখ ছিলাে , এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এমন এক শ্রেণী তৈরি করবে , যারা চিন্তা চেতনায় পুরােপুরি ইংরেজ হবে , আর রক্তেমাংসে থাকবে ভারতীয় । এটা বাংলা প্রেসিডেন্সির শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি । ব্রিটিশ ভারতেই যথার্থভাবে নারী শিক্ষার প্রচলন শুরু হয় । প্রথমেই ইংরেজ মিশনারিদের উদ্যোগে বিভিন্ন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় । রাজা রামমােহন থেকে ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর পর্যন্ত সমাজ সংস্কারকদের নারী শিক্ষার ওপর জোরালাে মত ছিলাে । তারা মনে করতেন , সমাজের অর্ধাংশ নারীকে শিক্ষাবঞ্চিত রেখে সমাজ কখনও এগিয়ে যেতে পারে না । এই বােধ থেকেই নারী শিক্ষার পথ অবারিত করার প্রচেষ্টা চালান ওই সমাজ সংস্কার করা। ইংরেজ মিশনারী রবার্ট মে ১৮১৮ সালে বাংলা প্রেসিডেন্সিতে সর্বপ্রথম একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন । ওই বিদ্যালয়টিই মেয়েদের জন্য স্থাপিত প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । চার্চ মিশনারী সােসাইটির পৃষ্ঠপােশকতায় মিস মেরি এ্যান কুক ১৮২৩ থেকে ১৮২৮ সালের মধ্যে অন্তত ৩০টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন । ঠিক ওই সময় শ্যামবাজারের একজন মুসলমান মহিলা মিস কুকের দিকে সহযােগিতার হাত বাড়ান । ওই মহিলা নিজে বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুসলমান ছাত্রীদের খুঁজে নিয়ে আসতেন । যে সময় মুসলমান পুরুষরাই আধুনিক শিক্ষাগ্রহণে অগ্রসর হতে পারেননি , সেখানে একজন অশিক্ষিত মুসলিম নারীর শিক্ষার জন্য এ ধরনের মহৎ উদ্যোগ ছিলাে আশ্চর্যের একটি বিষয় । তবে মিশনারী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্কুলে সেভাবে নারী শিক্ষার দ্বার অবারিত হয়নি । কারণ ধর্মান্তরিত হওয়ার আশঙ্কায় হিন্দু – মুসলিম সম্রান্ত পরিবারের মেয়েদের ওইসব বিদ্যালয়ে পড়তে দেয়া হতাে না । সম্রান্ত পরিবারের মেয়েদের জন্য প্রথম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পুরাে কৃতিত্ব বেথুন ও বিদ্যাসাগরের ।বেথুনের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও সদিচ্ছার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাে বিদ্যাসাগরে অনমনীয় দৃঢ়তা এবং সাহসী পদক্ষেপ । ফলশ্রুতিতে ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বেথুন গার্লস হাইস্কুল । তঙ্কালীন কলকাতায় মুসলমান মেয়েদের বেথুন স্কুলে পড়ার কোনাে সুযােগ ছিলাে না । খ্রিস্টান মিশনারীরা আমাদের বাংলাদেশেও বিভিন্ন জায়গায় মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত কাজে অব্যাহত রাখেন । এসব বিদ্যালয়ে মূলত বাইবেল শিক্ষা দেয়া হতাে । ফলে কোনাে সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়েরা এসব স্কুলে পড়তাে না । ১৮৬৮ সালে রাজশাহীতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের নজির পাওয়া যায় , যা বর্তমানে পিএন গার্লস স্কুল নামে পরিচিত । ১৮৬৮ সালে দুটি বালিকা বিদ্যালয়ের সন্ধানও রাজশাহীর বিভিন্ন নথিপত্রে পাওয়া যায় । একটি মিশন কর্তৃক পরিচালিত , অপরটি সরকারী সাহায্যপ্রাপ্ত । সরকারী সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়টি দীঘিপাতিয়ার জমিদার পিএ রায় বাহাদুর এই বিদ্যালয় চালানাের জন্য রাজশাহী জেলা বাের্ডের চেয়ারম্যানের কাছে ৬ হাজার ৩শ ‘ টাকা একটি দানপত্র হস্তান্তর করেন । ১৮১৭ সালে ঢাকায় মিশনারীদের উদ্যোগে প্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে ছেলেদের পাশাপাশি ২ / ১ জন মেয়েও পড়তে যেতাে । এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮২৫ সালে মেয়েদের জন্য আলাদা বিদ্যালয় খােলা হয় । ওই সালেই ঢাকায় বালক – বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১টি এবং ৫২১ জন ছাত্রের বিপরীতে ছাত্রী সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৯ জন । তবে কলকাতার মতাে ঢাকার সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরাও এসব স্কুলে পড়তে যেতাে না । ফলে বেগুনের মতাে ঢাকায় স্থাপিত হয় সম্রান্ত পরিবারের মেয়েদের জন্য একটি বালিকা বিদ্যালয় । আমাদের বাংলাদেশে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদান রাখে ইডেন গার্লস হাইস্কুল । প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮০ সালে । বাংলার গভর্নর স্যার এ ইডেন ঢাকায় এই বালিকা বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন । চট্টগ্রামের শিক্ষা এবং নারী শিক্ষার ইতিহাসও ঢাকার সমসাময়িকই বলা যায় । ডাঃ খাস্তগীর গার্লস হাইস্কুল একটি প্রাচীন বালিকা বিদ্যালয় । বিদ্যালয়টি জামাল খাঁ রােডে অবস্থিত । ভার্নাকুলার মিডল স্কুল হিসেবে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় । বিদ্যালয়টি হাইস্কুলে উন্নীত হয় ১৯০৭ সালে । বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গার মতাে চট্টগ্রামেও মিশনারীদের স্কুলে সম্রান্ত পরিবারের মেয়েরা পড়তে যেতাে না । ১৯১৩ সালে ইব্রাহীম কন্ট্রাক্টর নিজ গ্রামে মেয়েদের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার নিজের তিন কন্যাকে ওই স্কুলে ভর্তি করে দেন । তবে চট্টগ্রামে মুসলিম নারী শিক্ষা শুরু হয় ১৯২২ সালে । আম্বিয়া খাতুন নামে এক মহীয়সী নারী ‘ চন্দনপুরা মুসলিম বালিকা বিদ্যালয় নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন । যা পরবর্তীতে গুলজার বেগম গার্লস হাইস্কুল নামে পরিচিতি পায় । আর এটাই চট্টগ্রামে আধুনিক নারী শিক্ষার যাত্রা শুরু । নারী জাগরণ এবং নারী শিক্ষার পথিকৃত বেগম রােকেয়া ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযােগ পাননি । ভাই – বােনের সহযােগিতা এবং পরবর্তীতে স্বামীর অনুপ্রেরণাই তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হন । প্রথম থেকেই বেগম রােকেয়া অনুধাবন করেছিলেন , শিক্ষা ছাড়া নারী জাতির কোন মুক্তি আসবে না । আর তাই নিজের ক্ষুরধার লেখনীকে যেদিন শাণিত সুযােগ পান সেদিন সবার আগে তার সামনে এসে দাঁড়ায় এ দেশের ভাগ্যহত , লাঞ্ছিত , নিপীড়িত নারী সমাজ । তিনি শুধু নারী জাতিকে পথনির্দেশনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি , বাস্তব কর্মসূচীও হাতে নিয়েছেন নারী শিক্ষার দ্বার খুলে দিতে । তার প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াৎ মেমােরিয়াল গার্লস হাইস্কুলটি কলকাতায় মুসলমান মেয়েদের জন্য প্রতিষ্ঠিত তৃতীয় বালিকা বিদ্যালয় । এর আগে কলকাতায় মুসলিম বালিকাদের জন্য দুটো বিদ্যালয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় । কলকাতায় প্রথম মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়টি ১৮৯৭ সালে মুর্শিদাবাদের নবাব বেগম ফেরদৌস মহলের পৃষ্ঠপােশকতায় স্থাপিত হয়েছিল । ১৯০৯ সালে স্থাপিত হয়েছিল মুসলমান মেয়েদের জন্য দ্বিতীয় বালিকা বিদ্যালয় । সােহরাওয়ার্দী বালিকা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রসিদ্ধ মুসলিম বাঙালী নেতা সােহরাওয়ার্দী মাতা সমাজকর্মী খুজিস্তা আখতার বানু । এছাড়াও তিনি বস্তি এলাকায় দরিদ্রজনসাধারণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করতেন । তিনি নিজে ছিলেন সুশিক্ষিত । পিতার কাছে আরবী , ফার্সী , উর্দু ও ইংরেজী শিখেছিলেন । উপমহাদেশের মুসলিম মহিলাদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম সিনিয়র কেমব্রিজ পাস করেন । তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষকও ছিলেন । ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অবিভক্ত বাংলার নারী শিক্ষার দ্বার উন্মােচিত হলেও মুসলিম নারীর ক্ষেত্রে এ পথ সহজ – সরল ছিলাে না । ধর্মীয় অনুশাসন , সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কঠিন শৃঙ্খলকে অতিক্রম করে নারীদের শিক্ষা তথা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করা ছিলাে সত্যিকার অর্থে কঠিন ।

রুকসানা রহমান

Share on Social

4 thoughts on “নারী শিক্ষার গােড়াপত্তন

  1. বর্তমান সরকারের উচিত হবে আরো বেশি করে নারী শিক্ষা ও তাদের যথাযথ মর্যাদায় সরকারের সকল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করানো।

  2. Does your website have a contact page? I’m having problems locating it
    but, I’d like to shoot you an e-mail. I’ve got some
    suggestions for your blog you might be interested in hearing.
    Either way, great site and I look forward to seeing
    it develop over time.

  3. Have you ever thought about writing an e-book or guest authoring on other sites?
    I have a blog based upon on the same information you discuss and would
    really like to have you share some stories/information. I know my visitors would value your work.

    If you are even remotely interested, feel free to shoot me
    an e-mail.

Leave a Reply

Your email address will not be published.