হায়েনার তীক্ষ্ম নখ

হায়েনার তীক্ষ্ম নখগুলাে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে শিকারের দিকে ! সুযােগের অপেক্ষায় ওঁৎপেতে ছিলাে সে কোণাঘুপছিতে , ঝােপের আবডালে । এদিকে শিকারটি একাকি এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে । শব্দহীন পায়ে তারই পিছনে পিছনে চলেছে চতুর শিকারী । হঠাৎ আবির্ভাব , বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলে তার কাঁধে । একেবারে শিকারের পিছনে এসে দাঁড়ায় হায়েনাটি । কিছু বুঝার আগেই অভিজ্ঞ হাতে তার মুখ চেপে ধরে সে । নিকটস্থ ঝোপের আড়ালে নিয়ে যায় তাকে জোর করে টেনেহেচড়ে । জনমানব শূন্য নীরব – নিস্তব্ধ আলাে – আঁধারি এলাকা । এর একটু দূর দিয়ে পিচঢালা বড় সড়ক দিয়ে ছুটে চলেছে অগণিত গাড়ি । অদূরেই বাস্পশকট ছুটে চলেছে একের পর এক বিরামহীনভাবে । দূর্বল শিকারকে হায়েনাটি এলােপাথাড়ি কিল – ঘুষি মেরে অজ্ঞান করে ফেলে । পরাস্ত হয় শিকার । পটু হাতে পরিধেয় বস্ত্র খুলে নেয় তার । একবার নয় , দুবার নয় , একাই চার – চারবার ধর্ষণ করে শিকারকে । এই পৈশাচিকতা চলে টানা তিন ঘন্টা ধরে । ঘটনাটি ঘটে যায় রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কের পাশে ঠিক কোনাে এক সন্ধ্যের পরপরই । হায়েনারূপী শিকারীটি কিন্তু পরিবার পরিজনহীন ঠিকানাবিহীন একজন রাস্তার অতিনগণ্য মানুষ । চুরি চামারী আর ছিনতাই করা তার পেশা । সভ্যতা , মানবতা , সম্মান এবিষয়গুলাে তার একেবারেই অজানা । এগুলাে থেকে যােজন যােজন মাইল দূরে তার অবস্থান । বলা যায় , একেবারেই নাগালের বাইরে । তবে শিকারটি দেশের প্রধান বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্রী । এই মেধাবী ছাত্রীটির অবস্থান কিন্তু তুলনামূলকভাবে অতি উচ্চে , বহুগুণ সম্মানের জায়গাতেই , তথা ধর্ষকের বিপরীতে । তথাকথিত এই সভ্যসমাজ তার সম্মানটুকুর নিরাপত্তা দিতে চরম ব্যর্থতারই পরিচয় দিলাে ! তার যত্নে রাখা সম্মানটুকু রক্ষা হলাে না ! দূবৃত্তের হাতে প্রাণটুকু যাওয়া যতাে না বেদনার , তার থেকে কোটি কোটি গুণ বেদনার ও ক্ষোভের এই ধর্ষণের ঘটনাটি । এখন কথিত সভ্যসমাজ তাকে কীভাবে শান্তনা দেবে ? সমাজের শান্তনা দেয়ার জায়গাটা যে নিঃশেষ হয়ে গেছে , একেবারেই শূন্যের কোটায় । শিকার বাহ্যিকভাবে হয়তাে শান্ত থাকবে কিন্তু অন্তরসৃষ্ট থকথকে ঘাগুলাে কী সে শুকাতে পারবে জীবনে ? সে কি মুছে ফেলতে পারবে , তার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কুটিকার বিষাক্ত ছােবলের দগদগে ক্ষতগুলাে ? পারলেই মঙ্গল । থানায় মামলা হয়েছে । ধর্ষককে গ্রেফতার করেছে । পুলিশের হাতে সােপাদিত হয়েছে । আদালতে গেছে মামলাটি । আমরা জানি , প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে । সাক্ষ্য – প্রমান মিললেই ধর্ষকের শাস্তি হবে । হয়তাে জীবনের একটি অংশে তাকে জেলে কাটাতে হবে । এটা গদবাধা একটি নিয়ম , যা একটি প্রক্রিয়ায় সমাপ্তি ঘটবে । এতে নূন্যতম কষ্ট প্রশমিত হবে কী নারীত্বের চরম অপমানের শিকার ওই ছাত্রীটির । বিচারিক এই প্রক্রিয়ায় আপত্তি রয়েছে আমার । আমার আপত্তি ‘ প্রচলিত আইন ও বিচার ‘ পদ্ধতিতে । অপরাধ করে একজন । আপাতদৃষ্টে অপরাধীর শাস্তি হলেও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শাস্তি ভােগ করতে হয় ‘ শিকার ’ কে । আর নীরবে পরােক্ষভাবে এই শাস্তিটা দেয় ‘ সমাজ । ধর্ষণ নিয়ে আলােচনা হয়েছে আমাদের জাতীয় সংসদে । ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন আইন প্রণেতারা । দাবী করেছেন , শিশু ও নারী ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের পাশাপাশি এ ধরনের অমানবিক ও নিষ্ঠুর কর্মকান্ড নিরসনে প্রয়ােজনে ধর্ষকদের ক্রসফায়ারের । জাতীয় সংসদের বিরােধী দলের দু ’ জনসিনিয়র সংসদ সদস্য পয়েন্ট অব অর্ডারে এ দাবি জানালে তাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন সরকারী দলের প্রবীণ এক নেতা । আইন প্রণেতাদের অভিমত , ধর্ষকদের প্রয়ােজনে ক্রসফায়ারে দিলে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের নিষ্ঠুর ও অমানবিক কর্মকান্ড ঘটাতে সাহস পাবে না । আমিও আইন প্রণেতাদের দাবীর সাথে সহমত পােষণ করছি । আমি নিশ্চিত , সহমত পােষণ করবেন দেশের সচেতন সকল মানুষই । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষণে শিকার হলাে । ধর্ষণের পর সরকারের পক্ষ থেকে জরুরীভাবে পদক্ষেপ নিয়ে সেই ধর্ষককে গ্রেফতার করা হয় । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার পরপরই সাভারে আরেকটি মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে । এরপর ধামরাইয়েও একই ঘটনা ঘটে । আমার দৃষ্টিতে ২০১৯ সালে ধর্ষণের মহৌৎসব ঘটেছে আমাদের দেশে । কেননা ধর্ষণের সংখ্যা আতঙ্কজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে ? এর থেকে পরিত্রাণের উপায় দায়িত্বশীলদেরই খুঁজে বের করতে হবে । এক সময় দেশে এসিড নিক্ষেপ করার মাধ্যমে হত্যাকান্ড বেড়ে গিয়েছিলাে । তখনকার সরকার এটার প্রতিরােধে অপরাধীর শাস্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ড করে । ফলে এ ধরণের অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে । আমাদের দেশে প্রচলিত আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড । এই দন্ড পর্যাপ্ত নয় বলেই ধর্ষণের মতাে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না । তাহলে ধরে নিতে হবে , ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড পর্যাপ্ত নয় । আমার মনে হয় , ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড করা হলে এই ধরণের অপরাধ বহুলাংশেই কমবে । তবে বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা করা যাবে না । বছরখানেক ধরে মাদকের জন্য ক্রসফায়ার ‘ হচ্ছে । সমানে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে মাদক ব্যবসায়ী । যদিও মাদকের থেকে জঘন্য অপরাধ ধর্ষণ । তবে এখনাে পর্যন্ত একজন ধর্ষককেও ক্রসফায়ারে মারা হয়নি । ধর্ষণের মতাে এই জঘন্য বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে যদি ক্রসফায়ার ‘ – এর মতাে ব্যবস্থা চালু হয় , তবে এটা বহুণাংশেই প্রতিরােধ করা যাবে বলে আমার বিশ্বাস । সম্প্রতি টাঙ্গাইলে বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে । পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করে । সেদিন যদি পুলিশ ওই পাঁচ ধর্ষককে মধুপুরে নিয়ে গুলি করে মারতাে , তাহলে বিষয়টি দেশব্যাপী আলােড়িত হতাে । ধর্ষকরা অনেকটাই সাহস হারাতাে । একটার পর একটা ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে । মেয়েরা বাসে ওঠে । উদ্দেশ্য নিয়েই ওই বাসে আগে থেকেই ৪ – ৫ জন বসে থাকে । দেখা যায় ওরা কিন্তু যাত্রী নয় , ওরা ধর্ষক । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীটিকে ধর্ষণ করলাে একজন পিশাচ শ্রেণীর রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুরতুল্য একজন মানুষ । তাকে গ্রেফতার করা পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হতাে । প্রমান মিললে বা স্বীকারােক্তিমূলক জবানবন্দী দিলেই সেখানেই তাকে গুলি করে মেরে ফেলুক । ধর্ষকদের একমাত্র শাস্তি এটাই হওয়া উচিৎ । আর কোনাে ধর্ষক যেনাে সাহস না পায় । ভারতে একবার বাসে এক নারী গণধর্ষণে শিকার হয়েছিলাে । পরে পাঁচ ধর্ষককে গ্রেফতার করে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হয়েছে । যদি নিশ্চিত হওয়া যায় সে ধর্ষক , সেই এই জঘন্য কাজটি করেছে – তার আর এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনাে অধিকার থাকতে পারে না । ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে দিয়ে মেরে ফেলাতে কোনাে পাপ নেই বলে আমি বিশ্বাস করি । ওই পিশাচদের মেরে ফেললে সমাজ অনেকটা পরিশুদ্ধ হবে ।

রুকসানা রহমান

Share on Social

2 thoughts on “হায়েনার তীক্ষ্ম নখ

Leave a Reply

Your email address will not be published.