নারী ও ধর্মব্যবসায়ী

হার থেকে বেশ চললাে ধর্মসভা এর ব্যাত্যয় ঘটেনি পকেট আমাদের দেশে শহর নগর বন্দর গ্রাম গঞ্জে ধর্মসভার ধুম পড়ে শীতকালে । ধর্মব্যবসায়ীদের কাছে । শীতকালটা ব্যবসার প্রধান মৌসুম হিসেবেই বিবেচিত । ধর্মব্যবসায়ীরা নিজেদের মতাে করেই ওই সময়টায় ধর্মের পসরা সাজিয়ে বসেন । ধর্মকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করেন । আর মুঠোমুঠো টাকায় পকেট ভর্তি করেন । বছরের বাকী সময়গুলাে চলেন মহাআয়েসেই । গত শীতকালেও এর ব্যাতায় ঘটেনি । রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গােটা শীতকাল জুড়েই চললাে ধর্মসভা । ওইসব ধর্মসভাগুলাে থেকে মানুষ যতাে না ধর্মীয় শিক্ষা পেয়েছে , তার থেকে বেশী পেয়েছে বিনােদন তথা আনন্দের খােরাক । এক শ্রেণীর কথিত আলেম ধর্মসভাগুলােকে বিনােদনের উত্তম মাধ্যমই পরিণত করে ফেলেছেন । রসালাে গল্প আর নারী নিয়ে রগরগে কাহিনী যুবক ও মধ্যবয়সী পুরুষদের যৌন সুরসুরিমূলক আনন্দের খােরাকই যুগিয়েছেন বলে আমার মনে হয় । যারা স্বাভাবিকভাবে ধর্মাচারে আছেন তাদেরকে বলছি না , তারা বাদে অন্যরা যারা ওইসব ধর্মসভায় গেছেন , তারা বুকে হাত দিয়ে বলেন তাে , আপনি কতটুকু ধর্মজ্ঞান অর্জন করেছেন ? ধর্মীয় বক্তারা আপনাকে কি এতটুকুও ধর্মচারের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছেন ? আপনি যদি সত্যবাদি হন , তাহলে একবাক্যে আপনার উত্তর হবে , না । কেননা এমনতর উত্তর হলাে ? এই কারণে যে , ধর্মসভাগুলােতে ধর্ম বিষয়াদীর তুলনায় হাস্যরসের ভান্ডার খুলে দেয়া হয় বেশী ! সেই হাস্যরস আস্বাদনই করে বাড়ি ফিরেছে ধর্মসভায় অংশগ্রহণকারীদের বেশীর ভাগ মানুষ । অধিকাংশ ধর্মসভার বিষয়বস্তু তাফসীরুল কোরআন । অর্থাৎ পবিত্র কোরআনের বাংলা অর্থসহ ব্যাখ্যা ও বিধি – বিধান নিয়ে আলােচনা । তবে অধিকাংশ বক্তা বা আলােচকরাই সেদিকে তেমন একটা জান না । তারা মনুষ্য সম্প্রদায়ের একটি অংশকে টার্গেট করে রসালাে কথা – বার্তাকেই প্রধান্য দিয়ে থাকেন । সেই টার্গেটকৃতরা হলাে নারী । তাদের বক্তৃতায় নারীই মূখ্য ও রসালাে ’ উপাদান । আর এই রসালাে বক্তৃতাগুলাে রেকর্ড করে তা ইউটিউবে প্রচার করার ব্যবস্থা করা আছে । যে বক্তা নারী নিয়ে যতাে রসালাে মজাদার রগরগে যৌন সুরসুরিমুলক কথা বলতে পারেন , তিনিই হন সবচেয়ে জনপ্রিয় বক্তা এবং তার ব্যবসার সফলতাও বেশী । এরা ইসলামের কথিত পূজক ! ইসলাম এদের কাছে পণ্য আর ধর্মসভাগুলাে হলাে হাট – বাজার । ওই হাট – বাজারে থাকে সুসজ্জিত মঞ্চ । মঞ্চে থাকে ধর্মের কথিত পসরা সাজানাে । সেই সাজানাে পসরা থেকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে পণ্যগুলাে বিক্রি করেন , রাস্তার ক্যানৃভাচারদের মতাে । সামনের প্যান্ডেলে অবস্থানকারীরা তা কিনে নেন বিনােদনের অংশ হিসেবেই । কি কিনলাে ক্রেতারা – নারীকেন্দ্রিক হাস্যরস , নিজেদের বানানাে রসালাে কথাবার্তা আর কিছু গীবত । ধর্মসভাগুলােতে প্রকৃত ধর্মীয় বিষয়ে আলােচনা দশভাগও পাবেন না । বিশ্বাস না হলে এখনি আপনার মবােইলের ইউটিউব ওপেন করেন , ধর্মীয় বক্তাদের বক্তব্যগুলাে শুনেন । বিনােদন আর কাকে বলে , আপনি তার শতভাগ প্রমাণ পাবেন । তাদের বক্তব্যের মধ্যে নারীর অতি গােপনীয় রগরগে বিষয়াদীও স্পষ্টভাবেই উপভােগ করতে পারবেন । কিছুদিন আগে ইউটিউবে বিভিন্ন ধর্মীয় বক্তার বক্তৃতা শুনছিলাম । ভ্যালেন্টাইন ডে ( বিশ্ব ভালােবাসা দিবস ) নিয়ে এক বক্তা যে বক্তৃতা করেছেন , তা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম । মনের মধ্যে একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল আমার , ‘ ওই বক্তাকে কোনাে নারী কি গর্ভে ধারণ করেছিলেন ? ’ ফেব্রুয়ারীর ১৪ তারিখ একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলােচিত । বিষয়টির সাথে ধর্মের কোনাে সম্পর্ক নেই । ঘটনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে । তাই দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে থাকে । তবুও তা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক প্রমাণ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত এদেশের কতিপয় ধর্মব্যবসায়ী । তারা এটাকে ভিনদেশীয় ও ভিনধর্মীয় আবরণে আবৃত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ।আমি নিশ্চিত যে , ওই বক্তা আসলেই একজন ধর্মব্যবসায়ী , নাম মুফতী সাঈদ আহমদ কলরব । তিনি এক ওয়াজ মহাফিলে বলেছেন , দিবসটি ‘ পতিতা দিবস ’ ( ছিঃ ! ) । তখন তার স্বর ছিলাে বেশ উচ্চ । যুক্তি দেখিয়েছেন , ওইদিন জোড়ায় জোড়ায় নারী পুরুষ ব্যভিচারে লিপ্ত হয় । কক্সবাজারের হােটেলগুলাে ব্যভিচারদের দখলে থাকে । তাদের কারণে হােটেলগুলােতে রুম পাওয়া যায় না । কি অকাট্য যুক্তি ও মন্তব্য । এই বক্তব্য দেয়ার মাঝে তিনি উচ্চস্বরে বলে ওঠেন , ‘ ঠিক না বেঠিক । না বুঝেই শ্রোতারা বক্তব্যে রসালােতা পেয়ে সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে , “ ঠিক ঠিক । ধর্মসভায় নারীদের ‘ পতিতা ’ বলেতে তিনি এতটুকু কার্পণ্য করেননি । দ্বিধান্বিত হননি । কোনােরূপ জড়তাও ছিলাে না তার । এই বক্তব্যের মধ্যে ওই ধর্মব্যবসায়ীর রুচিরও পরিচয় মেলে । আমার প্রশ্ন , তিনি যদি একজন ধর্মাজ্ঞ হন ! ধর্মীয় জ্ঞানের ভান্ডার যদি তার স্ফিতই হয় ! তবে দিবসটি ‘ পতিতা দিবস ’ কেনাে ? ‘ ব্যভিচার ’ – এ কি শুধু নারীই অংশ নেয় ? পুরুষ প্রয়ােজন হয় না ? নারীকে পতিতা বললেন , পুরুষকে কিন্তু তিনি কিছুই বলেননি । কেনাে ? তাহলে কি ধরে নেয়া যায় না , তার বক্তব্য একপেশে ও উদ্দেশ্যপ্রনােদিত । ব্যভিচারে অংশগ্রহণকারী নারী হয় ‘ পতিতা ’ আর পুরুষ থাকে ‘ পবিত্র ’ ! অথবা তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে ওয়াজ মহফিল গরম করে নিজের ব্যবসায়ীক প্রসার ঘটানাে হীন প্রচেষ্টা করেছেন মাত্র । আর তিনি জানলেনই বা কিভাবে , কক্সবাজারের হােটলগুলােতে ওইদিন জোড়ায় জোড়ায় নারী – পুরুষ ব্যভিচারে লিপ্ত হয় ! তার কি এ ধরণের বাস্তব পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে । না কি , তিনিও একই পথের পথিক ! নিশ্চিত করে বলা যায় , এই ধর্মব্যবসায়িরা ধর্মকে বারােটা বাজাচ্ছেন । ধর্মসভাগুলােতে নারীকেন্দ্রিক রগরগে রসালাে বক্তৃতা করে যুবসমাজের মধ্যে যৌন সুরসুরি উস্কে দেয়ার ঘৃণ্য অপচেষ্টা তিনি করছেন , এই অভিযােগে তাকে অভিযুক্ত করলে মনে হয় ভুল হবে না । ধর্ম মানুষকে মানবিক পরিশুদ্ধতা শেখায় । বলতে দ্বীধা নেই , আর এই পরিশুদ্ধতা শেখানাের প্রতিবন্ধকতা একমাত্র এই ধরণের অরুচিকর ধর্মব্যবসায়ীরাই । এরা ধর্মকে অপব্যবহার করে মানুষকে ধর্মের পথে নয় , বিপথগামীই করে চলেছেন । এদের থেকে যতাে দূরে থাকা যাবে , ততােই মঙ্গল । অন্তত ধর্ম নিরাপদ থাকবে , এটা আমি হলফ করেই বলতে পারি ।

রুকসানা রহমান

Share on Social

1 thought on “নারী ও ধর্মব্যবসায়ী

Leave a Reply

Your email address will not be published.