#নষ্টমা#

একদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে শুনলাম, আমার মা চলে গেছে ! মায়ের কোন প্রিয় কারো হাত ধরে রাতের আঁধারে মা ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে !

আমার বয়স তখন নয়। আমাকে বোঝানো হলো, আমার মা একজন নষ্টা মহিলা। তা না হলে ঘরসংসার, স্বামী, একমাত্র মেয়েটাকে ফেলে একজন মানুষ কি করে ঘর ছাড়ে? আমার বাবা চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করে বলছিল, মাগী যদি গেলই তবে মেয়েটাকে নিয়ে গেল না কেন? বড় হয়ে এই মেয়েও তো তার মায়ের মত মাগীই হবে !!

আমার চাচাচাচী, ফুফুরা সবাই এসে বাড়ি ভরে গেল। কি লজ্জার কথা ! সমাজে মুখ দেখানোই তাদের দায় এখন। কয়টা দিন বাড়িতে দোজখের আযাব গেল যেন ! তারপর একদিন সবাই বাবাকে স্বান্তনা দিয়ে, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় নিল। আমার নানাবাড়ির কেউ যেন আমাদের বাড়িতে ঢুকতে পর্যন্ত না পারে সে ব্যাপারে বাবা কড়া নির্দেশ দিয়ে দিল।

আমি জেবা, এক নষ্ট মায়ের মেয়ে। সমাজের বাঁকা চোখ, নোংরা ইঙ্গিত সব উপেক্ষা করে,কোনঠাশা না হয়ে আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলাম বাবার কাছে। বাবার স্নেহমমতা থেকে একরকম বঞ্চিতই বলা চলে। একটা ভালবাসাহীন পৃথিবীতে বড় হতে হতে আমি সত্যিই বড় হয়ে গেলাম। বাবার কাছে কৃতজ্ঞ যে, আমার পড়ালেখাটা বাবা চালিয়ে নিলেন। আমি বরাবরই লেখাপড়াই মনযোগী ছিলাম। আমার ভেতরে একটা জিদ কাজ করতো, আমাকে বড় হতে হবে! হতেই হবে ! নস্টা মায়ের মেয়ের খেতাবটা মুছে ফেলতে হবে।

সরকারী চাকরীর সুবাদে আমার এখন বগুড়াতে পোস্টিং। বাবা ঢাকাতে।সবসময় দেখাশোনার জন্য একজন ছেলে রেখেছেন

পৃথিবী পৃথিবীর নিয়মেই চলছে। প্রতিদিন ভোর হয়, সন্ধ্যা নামে। দিন রাত্রীর এই সন্ধিক্ষনে আমার কখনো কখনো খুব একা লাগে। নিজের মধ্যে এক রহস্যের সূচনা তৈরী হয়। খুব জানতে ইচ্ছে করে, কি এমন পরিস্থিতিতে একজন মা তার নয় বছরের মেয়েটাকে ফেলে চলে আসে। তারপর আর কোন খোঁজ রাখেনা !

ব্রাউন রঙের খামে আমার কাছে গত দুমাসে তিনটা চিঠি আসে। একজন নষ্টা মায়ের চিঠি। আবেগ জড়ানো ভাষা, শুধু একবার তার মেয়েকে দেখার জন্য আকুতি! আমি অবহেলায় সে চিঠি পড়ে ফেলে রাখি। মা যেমন একদিন অবহেলা ভরে নিজের সুখের কথা ভেবে আমাকে ফেলে রেখে এসেছিল !

মায়ের কাছে শুধু একবার জানতে ইচ্ছে করে আমার, আমি কি অপরাধ করেছিলাম? কেন আমাকে ফেলে চলে এলে? সিদ্ধান্ত নিলাম আমি যাবো মায়ের কাছে একদিন। আমার আরো কিছু কথা বলার আছে মায়ের সাথে।

বগুড়া থেকে সকালের বাসে রওনা দিলাম ঢাকার দিকে। মা থাকে কল্যাণপুর। চিঠিতে ঠিকানা দেয়া ছিল।

কুড়ি বছর পর আমি আর আমার নষ্টা মা মুখোমুখি দুজনার। কিছুক্ষন আমরা কোন কথা বলতে পারিনি। মা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। হয়তো চোখের জল লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা। আমি মেঝের দিকে তাকিয়ে সাতপাঁচ কত কি ভাবছি। নীরবতা ভেঙ্গে আমিই কথা শুরু করলাম।

আমাকে ডেকেছো কেন?

তোমার সাথে কথা বলার জন্য।একটিবার দেখার জন্য।

আমাকে বেশ ব্যস্ত থাকতে হয়। যখন তখন এমনি করে ডাকবে না। তাছাড়া এতো বছর পর কি এমন কথা থাকতে পারে! দেখারই কি আছে আমাকে!

জেবা, আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃনা কর। সেটাই স্বাভাবিক, মা। তবু তোমাকে জানাতে ইচ্ছে করে অনেক কথা।

আমার আগ্রহ নেই। আর তুমি যা করেছো, তা আজকাল অনেকেই করছে। শুধু এর কুফল ভোগ করছে কে জানো? আমি এবং আমার মত হাজার অভাগাজন!

আমার কোন উপায় ছিল না! তোমার বাবার অত্যাচার, অনাচারে আমি অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম। শারিরীক নির্যাতনে আমি প্রায়ই অজ্ঞানের মত পড়ে থাকতাম। তোমাকেও যত্ন করার শক্তিটুকু আমার থাকতো না। তুমি মাঝেমাঝে ভয়ে ঝিম মেরে পড়ে থাকতে।

আর এসব থেকে মুক্ত হবার জন্যই রাশেদ চাচার হাত ধরে স্বার্থপরের মত পালিয়ে বাঁচলে? সমাজের কথা বাদ দিলাম, এই আমার কথা একবারও ভাবলে না তুমি?

তোমার রাশেদচাচা চেয়েছিল, তুমি আমাদের সাথে থাকো, কিন্তু আমি তা চাইনি। আমি চেয়েছিলাম, তুমি তোমার নিজের পিতৃপরিচয়ে বড় হও।পৃথিবীতে হাজার হাজার খারাপ হাজবেন্ড আছে কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই!

কিন্তু কেউ কি কারো পরিপূরক হতে পারে? বাবা কি কখনো মায়ের দায়িত্ব করতে পারে? আমি কিভাবে বেড়ে উঠেছি জানো? আমার যখন প্রথম পিরিয়ড হয়েছিল,তখন আমি কতটা অসহায় হয়ে পড়েছিলাম! আমাকে প্যাড কিনে দেবার কেউ ছিল না। কি ভয় পেয়েছি সেদিন। ম্যানেজ কি করে করতে হয় জানা ছিল না, স্কুল ড্রেসের পিছনে দাগ ভরে গিয়েছিল! দুষ্টু ছেলেগুলো কি বিশ্রী কথা বলাবলি করছিল !

ক্লাস এইটে পড়ার সময় ফাহমিদা ম্যাডাম ডেকে অনেক অপমান করেছিলেন ব্রা না পরার জন্য। আমাকে কে ব্রা কিনে দেবে? বাসায় যে হুজুর স্যার আমাকে আরবী পড়াতেন, তিনি সুযোগ পেলেই আমার শরীরে অনাকাংখিত স্পর্শ করতেন ! আমি কাউকে বলতে পারিনি। আমার কথা শোনার কেউ ছিল না!

জাহিদ নামের যে ছেলেটা আমাকে পাঁচ বছর ভালবেসেছিল, গতমাসে সে তার মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছে। আমার মত একটা নষ্টা মায়ের মেয়েকে কেউ ছেলের বৌ বানাতে চায়বে না। এটাই বাস্তব।

জেবা ! মা আমার!

আমাকে উঠতে হবে।

আর একটু বসো। আমি এক দিনের জন্যও ভালো থাকিনি, মা তোমাকে ফেলে আসার কষ্ট, পাপ আমাকে প্রতিনিয়ত শেষ করেছে। পরে আমি দুটো ছেলের মা হই।কিন্তু তোমার শূন্যতা আমার কখনোই পূরন হয়নি,জেবা। আকাশে, বাতাসে আমি আমার ফেলে আসা সন্তানের কান্না শুনেছি রে, মা !!! সে খুব কষ্টের, খুব কষ্টের! আমি আর ফিরে যেতে পারিনি। সব সময় ফেরা যায় না।

আমাকে আর আসতে বলো না। তোমার ঘরসংসার দেখে গেলাম। ভালো থাকো।

জেবা?

বলো।

তোমার রাশেদ চাচা তিন বছর হলো মারা গেছেন।

তুমি তো বেশ একা হয়ে গেছো তাহলে।

আমিও আর বেশীদিন নেই।

মানে?

শরীরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। ফোর্থ স্টেজ। আর কিছুদিন….!

হঠাৎ করে আমার কি যে হলো ! ছোটবেলায় মায়ের বুকে ঘুমানোর সময় যে গন্ধটা পেতাম, সেই গন্ধটা নাকে এসে লাগলো।

বাইরে প্রচন্ড মেঘ করেছে। আমাকে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। আমার চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে কেন? হ্যান্ডব্যাগটা হাতে তুলতেই,

জেবা, মা আমার ! আমাকে একটিবারও তো মা বলে ডাকলি না?

আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে!

শুধু একটিবার….!

ভালো থেকো, মা…!!

বাইরে বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চারিদিক।

আর ঘরে এক মায়ের বুকের আঁচল ভেসে যাচ্ছে সন্তানের বহুদিনের জমানো অভিমানী অশ্রুতে ! মা যেন আজ পাথর হয়ে গেছে ! শূন্য দৃষ্টিতে অপলক চেয়ে আছে দূরে, বহু দূরে কোথাও!

সংগৃহীত

Share on Social

2 thoughts on “#নষ্টমা#

  1. খুবই অসাধারণ একটি লেখা। অনেক ভাল লাগল। তবে আমাদের এই পুরষ তান্ত্রিক সমাজে নারীর/মেয়েদের কি-ই বা করার থাকে এটা ছাড়া।

  2. Auto Like, auto liker, Auto Liker, Autolike, Working Auto Liker, autoliker, Autolike International, Autoliker, autolike, Photo Auto Liker, Photo Liker, ZFN Liker, Autoliker, auto like, Increase Likes, Status Liker, Status Auto Liker

Leave a Reply

Your email address will not be published.