ধর্ষণ ও ধর্ষণের সমাজ

ধর্ষণের মাত্রা বড় না হলে আলোচিত হয় না, জমে না বাগাড়ম্বর আলোচনা।কিন্তু সমাজে ধর্ষণ যে প্রতিনিয়ত হচ্ছে এবং দিনকে দিন বেড়েই চলছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

ধর্ষণের নানা সংজ্ঞায়ন আছে। কেউধর্ষণকে এক ধরনের যৌন আক্রমণ বলছেন। অনেকের মতে, একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। ধর্ষণ এক ধরনের যৌন আক্রমণ!

বলতে গেলে, অর্থনীতির সব সূচকেই আমরা দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু অর্থনীতির বাইরে সামাজিক সভ্যতার সূচকে লজ্জিত হচ্ছি।

নিরাপদ নিশ্চিত জীবন উন্নত জীবনমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু আমরা দেখছি, আমাদের সমাজে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নানাভাবে আক্রান্ত। শিশু নারীরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশুরা ঘরেবাইরে এমনকি কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কতিপয় শিক্ষকদ্বারাও নানা নির্যাতন হয়রানির শিকার হচ্ছে। নারীরা কর্মক্ষেত্রে বা গণপরিবহনে কিংবা সড়কে নিশ্চিত নিরাপদ নয়।এমনকী নিজের ঘরেও নিরাপদ নয়। আর এই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাতে ৮ই জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের (২০১৯) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাসে বাংলাদেশে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ধর্ষণের পর এক ছেলে শিশুসহ মোট ১৬ জন শিশু মারা গেছে।

পরিসংখ্যানই বলছে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।

বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ বলছে, তারা এক গবেষণার অংশ হিসাবে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে। গবেষণাটির পরিচালক এবং নারীপক্ষের প্রকল্প পরিচালক রওশন আরা বলেন, সময়ে ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ৬৩০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সময় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ নারীকে। মানবাধিকার সংগঠন আইন সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ছয় মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে চিত্র উঠে এসেছে।

সমাজে প্রতিনিয়ত দেখছি, কতিপয় শিক্ষকের দ্বারা শিক্ষার্থীরা যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। রেহাই পাচ্ছে না বাবার লালসা থেকে মেয়েও। ধর্ষণ হচ্ছে, হচ্ছে ধর্ষণের পর মৃত্যুর ঘটনাও। ঘটনার পরিক্রমায় সোচ্চার হচ্ছে নাগরিকরা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সুরাহা কিংবা পরিত্রাণ মিলছে না। এর কারণ কি? আসল গলদাটাই বা কোথায়?

উত্তরে আসতে পারে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। গায়ের জোরে পার পেয়ে যাওয়া।বাংলাদেশে আইনে দুর্বলতার কারণে ধর্ষণের মামলায় অনেক অভিযুক্ত পার পেয়ে যাচ্ছে বলে মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ। তারা বলছেনআইনের মধ্যে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো ধর্ষিতার বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশে ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা মামলার বিচারের প্রশ্নে নিম্ন আদালতের বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য হাইকোর্ট একটি সাত দফা নির্দেশনা জারিও করেছে। কিন্তু কার্যকর হচ্ছে কি না, বাস্তবতা বলে দেবে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে শিশু ধর্ষণ। চকলেট কিংবা খাবারের লোভ দেখিয়ে নানাভাবে শিশুদের লালসার শিকারে পরিণত করে ধর্ষকরা। পরে হত্যা করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না এই পাষাণ্ডরা। বরাবরই ধর্ষণের পেছনে নারীদের পরিধেয় কাপড়কে দোষারোপ করা হয়, কিন্তু শিশুদের বেলায় এই যুক্তিটা ক্ষুরা হয়ে যায়। ধর্ষণে শিশুদের বেলায়ই সবচেয়ে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা নির্যাতন। দেশব্যাপী শিশু ধর্ষণ, হত্যা নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সচেতন দেশবাসী অভিভাবক মহল আজ রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।স্কুল, মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বাসেলঞ্চে, পথেঘাটে, মাঠে কোথাও আজ যেন শিশুরা নিরাপদ নয়।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের (২০১৯) এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারা দেশে ৪৭টি শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর এক হাজারেরও বেশি নারী শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শুধু চলতি বছরেই নয়, বিগত বছরগুলোতেও দেশে শিশু ধর্ষণ, হত্যা নির্যাতনের চিত্র ছিল ভয়াবহ।

গত বছর (২০১৮) ধর্ষণের শিকার হওয়ার মোট ৩৪৫টি সংবাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩৫৬, যার মধ্যে মারা গেছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালের শুরু থেকে ২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৯৫০ এর বেশি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিনিয়ত এই ঘৃণ্য অপরাধের মাত্রা বাড়ছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, সারা দেশে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলছে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা নির্যাতন। দেশব্যাপী শিশু ধর্ষণ, হত্যা নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সচেতন দেশবাসী অভিভাবক মহল আজ রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

স্কুল, মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বাসেলঞ্চে, পথেঘাটে, মাঠে কোথাও আজ যেন শিশুরা নিরাপদ নয়। এই অবস্থায় শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন হত্যা বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে অবস্থা আরো ভয়ানক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের (২০১৯) এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারা দেশে ৪৭টি শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টাও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর এক হাজারেরও বেশি নারী শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শুধু চলতি বছরেই নয়, বিগত বছরগুলোয়ও দেশে শিশু ধর্ষণ, হত্যা নির্যাতনের চিত্র ছিল ভয়াবহ।মানুষের জন্য ফাউন্ডেশননামের ওই বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, গত বছর (২০১৮) ধর্ষণের শিকার হওয়ার মোট ৩৪৫টি সংবাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩৫৬

প্রকাশিত আরো একটি রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে মোট ২৭৬টি শিশু হত্যা হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ২২৭ জন। পরিসংখ্যান থেকে এটা স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, আমরা যেন কোনো ভাবেই শিশু ধর্ষণের লাগাম টেনে ধরতে পারছি না।

অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দেশে এক হাজার ৩০১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যার মধ্যে প্রতিবন্ধী, গৃহকর্মী স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা রয়েছে।

প্রতিনিয়ত এই ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া কিংবা পেশী শক্তির জোরে অনেক সময় পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক সময় দেখা যায় যে,অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। শিশু হত্যা, শিশু নির্যাতন শিশু অপহরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি যে আরো ভয়াবহ হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

ধর্ষণ ধর্ষণের পর হত্যা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। নারী শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ধারা মোতাবেক ধর্ষণের অপরাধে যেসব শাস্তির বিধান রয়েছে তা হচ্ছেধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত কমপক্ষে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড। একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে, তবে ওই দলের সবার জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ ১০ বছর সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেরও বিধান রয়েছে। কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো বা আহত করার চেষ্টা করলে ধর্ষণকারী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবে। তবে শিশু ধর্ষণ বা নির্যাতন বা হত্যা বিষয়ে মামলা করে বিচার পাওয়ার চেয়ে সমাজে যেন ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই না ঘটে সে ব্যবস্থা নেওয়া অতি জরুরি। কারণ  “Prevention is better than cure”.

ধর্ষণের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের দর্শন নৈতিক মনোবৃত্তির উন্নয়ন ঘটাতে হবে, আমাদের মনের অশুভ চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত কণ্ঠে প্রতিবাদ হওয়াটা খুবই জরুরি। ধর্ষকরা অনেক সময় শাস্তি পায় না বলেই পরবর্তী সময়ে তারা আবারও একই কাজ করে। আর তাদের দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হয়। এভাবে চলতে থাকলে সমাজ, দেশ জাতি কলুষিত হবে। দেশ পরিণত হবে এক মগের মুল্লুকে। যাচ্ছে তাই হতে থাকবে।

ধর্ষকের শাস্তিতে নতুন আইনে ভারত

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার সব দেশ। কঠিন শাস্তি হতে যাচ্ছে ভারতেও। ধর্ষকের শাস্তি কেমন হবে তা নিয়ে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করেছে ভারত সরকার।

ভারতের অপরাধ আইন (সংশোধনী) অধ্যাদেশ অনুসারে এখন থেকে এই ধরনের মামলার জন্য নতুন ফাস্ট ট্র্যাক আদালত তৈরি হবে। তদন্তের জন্য থানা এবং সমস্ত হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ফরেনসিক কিট দেওয়া হবে।

এই আইনে বিচারের আবেদন এবং তদন্তের সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী ধর্ষণ মামলার দুই মাসের মধ্যে পুরো বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা করতে হবে।

১৬ বছরের নীচে কোন মেয়েকে ধর্ষণ বা গণধর্ষণ করলে অভিযুক্তরা কোনভাবেই আগাম জামিন পাবেন না বলেও এই আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ১২ বছরের নিচে শিশু ধর্ষণের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। ১২ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত মেয়েদের ধর্ষণের জন্যে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যে কোন ধর্ষণের ক্ষেত্রে নূন্যতম সাজা সাত বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে।

রুকসানা রহমান

Share on Social

1 thought on “ধর্ষণ ও ধর্ষণের সমাজ

Leave a Reply

Your email address will not be published.